ঈদ জামাত নিয়েও ছিল শামীম ওসমানের রাজনীতি

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান যিনি বহু হত্যা, গুম, নির্যাতন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত রাজনীতির মাঠে ছিলেন বেপরোয়া৷ তিনি স্থানীয়ভাবে আধিপত্য ধরে রাখতে ধর্মকেও ‘পুঁজি’ করেছিলেন৷ মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ উৎসব ঈদের জামাত নিয়ে রাজনীতি করেছেন এ আওয়ামী লীগ নেতা৷
প্রতিবারই নির্বাচনের আগে ঈদ জামাত আয়োজন করে আলোচনায় ছিলেন শামীম ওসমান৷ প্রতিবারই দেশের ‘সর্ববৃহৎ’ ঈদ জামাতের আয়োজন করেছেন বলে দাবি করেন৷ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগেরবছরও ঈদ জামাত আয়োজন করলেও গতবছর নির্বাচনের পরের ঈদে কোনো জামাতের আয়োজন করেননি৷
গত বছর এপ্রিলে ঈদুল ফিতরের দুই মাস পরই শুরু হয় সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন৷ এ আন্দোলন জুলাইয়ে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়৷ এ আন্দোলনে হাজারো প্রাণ ঝরলে ফুঁসে ওঠে জনতা৷ গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷ প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান৷
দলীয় প্রধানের পাশাপাশি দেশ ছেড়ে পালান আওয়ামী লীগের আরও অনেক নেতা ও মন্ত্রী৷ সপরিবারে পালিয়েছেন শামীম ওসমানও৷ দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এ সাবেক সংসদ সদস্যের অনুপস্থিতিতে আলোচিত হচ্ছে তার ঈদ জামাত নিয়ে রাজনীতি৷
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগ দিয়ে আগে শোলাকিয়ার মতো নারায়ণগঞ্জে আগামী ঈদুল আযহার নামাজের বৃহৎ জামাতের আয়োজনের ঘোষণা দেন শামীম ওসমান। ওই বছরের ১২ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ ক্লাব মিলনায়তনে জেলা প্রশাসক, জেলার ৭ শতাধিক ইমাম ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে এক আলোচনা সভায় প্রথম ঈদ জামাত আয়োজনের ঘোষণা দেন।
ওই বছরের ২২ আগস্ট ঈদের দিনে শামীম ওসমানের তত্ত্বাবধানে সকাল সাড়ে ৮টায় নগরীর ইসদাইর এলাকায় একেএম শামসুজ্জোহা স্টেডিয়াম ও কেন্দ্রীয় ইদগাহ সমন্বয়ে এ ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়৷ তিনি ঈদ জামাতটিকে সর্ববৃহৎ ঈদ জামাত বলে দাবি করলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঈদ জামাত প্রাঙ্গণের অনেক অংশই ফাঁকা ছিল৷
নির্বাচনের পরে ২০১৯ সালের ৫ জুন ঈদুল ফিতর পবিত্র মক্কা ও মদীনা শরীফের আদলে দেশে প্রথমবারের মতো স্টিল স্ট্রাকচার প্যান্ডেলের বৃহৎ ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়৷ এটিও আয়োজন করেছিলেন শামীম ওসমান৷
এবার ইসদাইর এলাকায় কেন্দ্রীয় ঈদগাহ সংলগ্ন শামসুজ্জোহা ক্রীড়া কমপ্লেক্স মাঠে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়৷
সেবার ঈদ জামাত আয়োজনের আগে শামীম ওসমান বলেছিলেন, “আশা করেছিলাম বৃহত্তর ঈদ জামাত অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সিটি কর্পোরেশন কিছু একটা ব্যবস্থা করবে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় গত তিনটি ঈদ জামাতের ব্যাপারে কিছুই করেনি সিটি কর্পোরেশন। এটি করার দায়িত্ব ছিল সিটি কর্পোরেশনের।”
তিনি বলেন, “সিটি কর্পোরেশন যদি এ কাজে এগিয়ে না আসে তবে সবার সহযোগিতায় নারায়ণগঞ্জে বৃহত্তর ঈদের জামাত অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সচেষ্ট থাকব আমি।”
এরপর দেশে করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০২০ সালের ঈদুল ফিতরের মতো ঈদুল আযহার নামাজ আয়োজন করা হয়নি।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে ২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের জামাতের প্রস্তুতি পরিদর্শন শেষে এবারের নারায়ণগঞ্জে ঈদ-উল-ফিতরে দেশের সবচেয়ে সুন্দর ঈদজামাত হবে বলে ঘোষণা দেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) একেএম শামীম ওসমান।
সাংবাদিকদের শামীম ওসমান বলেন, “আপনারা জানেন করোনা মহামারির কারণে আমরা গত তিন বছর এ ঈদের জামাত করিনি। এটা প্রচুর ব্যয়বহুল। প্রতিবছর বেশ কিছু মানুষ এগিয়ে আসেন এবারও এগিয়ে এসেছেন। এবার আগের চেয়ে অনেক সুন্দর করে করা হচ্ছে। বাংলাদেশের মধ্যে এটা সবচেয়ে সুন্দর ঈদের জামাত হবে।”
নির্বাচনের পর আবার ঈদ জামাতের আয়োজন বন্ধ করে দেন শামীম ওসমান৷
সমালোচকদের দাবি মূলত নির্বাচনের আগে ভোটারদের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করতে এই ঈদ জামাতের আয়োজন করতেন তিনি। নির্বাচনী বৈতরণী পার হলেই আবার এই আয়োজন বন্ধ করে দিতেন।